Showing posts with label Agriculter Tips. Show all posts
Showing posts with label Agriculter Tips. Show all posts

নারিকেল গাছে মাইটের আক্রমণ ও তার দমন ব্যবস্থা

-এম এনামুল হক

মাইটের আক্রমণে নারিকেল গাছের ক্ষতি সম্বন্ধে আগে অজানা ছিল। এ মাইটের উপস্থিতি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৬৫ সালে মেস্কিকোতে। এর পর পরই এ মাইটের উপস্থিতি ব্রাজিলে ও আইভোরী কোষ্টে দেখা যায়। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে ভারতের কেরালাতে এ মাইটের আক্রমণ লক্ষ্য করা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় ভারতে এ মাইটকে নারিকেলের জন্য অপ্রধান ক্ষতিকারক পেষ্ট হিসাবে বিবেচনা করা হয়। পরে ভারতে ১৯৯৯ সালে ডিসেম্বর মাসের শেষ ভাগে কেরালায় এ মাইট মনিটরিং এর জন্য বিস্তারিত সার্ভের আয়োজন করা হয়। তাদের এ সার্ভের ফলা ফলে দেখা যায়, তদাঞ্চলে প্রায় ৫৮৯ লক্ষ্য ফলন্ত নারিকেল গাছ এ মাইট দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এ আক্রমণের প্রতিকূল প্রভাবে এ সব নারিকেলের ফলন প্রায় ৪২% কম হতে দেখা যায়। তখন থেকেই ভারতে এ নারিকেল মাইটকে প্রধান ক্ষতিকারক পেষ্ট হিসাবে চিহ্নিত করে সরকারিভাবে তা দমন ব্যবস্থার বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। একই গুরুত্ব বিবেচনায় এনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ মাইট সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণার ব্যবস্থা নিয়ে এ দেশে এ মাইটের উপস্থিতি ও তার দমন ব্যবস্থা সর্ম্পকিত বিস্তারিত সুপারিশ মালা নারিকেল চাষীদের বৃহত্তর স্বার্থে প্রণয়ন করতে পারে ।

নারিকেলের মাইট (ঊৎরড়ঢ়যরফ) চিহ্নিতকরণঃ নারিকেল মাইট ‘ইরিওফিড’ নামে পরিচিত, যা অন্য মাইট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এ মাইটের আকারে খুবই ছোট। খালি চোখে তা দেখা সম্ভব নয়। প্রায় ১০-১৫ গুণ  পাওয়ার বিশিষ্ট ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে তা দেখা সহজ হয়। একটা নারিকেল মাইট লম্বায় প্রায় ২০০-২৫০ মাইক্রোন এবং চওড়ায় প্রায় ২০-৩০ মাইক্রোন হয়। সাধারণ মাইটের ৪ জোড়া বা ৮ টা পা থাকে। অথচ নারিকেলের ক্ষতিকারক এ মাইটের পায়ের সংখ্যা মাত্র ৪ টা। পুরুষ মাইটের তুলনায় স্ত্রী মাইট আকারে কিছুটা বড়। মাইটের জীবন চক্র শেষ হতে সময় লাগে মাত্র ১০-১২ দিন। শীত মৌসুমে এ চক্র শেষ হতে কিছু বেশী সময় লাগে, এ সময় চক্র শেষ হয় প্রায় ১৫-২১ দিনে। ডিম ফুটে  ৩-৪ দিন পর ‘লার্ভা’ বের হয় পরে তা রূপান্তরিত হয়ে ‘নিমফ’ আকার ধারণ করে। এর কয়েক দিনের মধ্যেই তা পুর্ণাঙ্গ মাইট রূপ ধারণ করে।

নারিকেল মাইটের তৎপরতা ও ক্ষতি : ফুল ফল ধরার জন্য নারিকেলের যে কাঁদি বের হয় এবং তাতে ক্ষুদ্র কচি নারিকেল গাঁথা/ধরার সংগে সংগে মাইট তার বোটার অংশের উপরিভাগে যে ক্যাপ বা খোলস থাকে তার নিচের অতি নরম অংশে অবস্থান অংশের টিস্যু খুব নরম থাকে। তাই অবাধে এ অংশ ক্ষত করে মাইট ভিতরের রস চুষে খায়। কচি ফল ধরার পর থেকে তা নারিকেল হতে সময় লাগে প্রায় বার মাস। কচি ফল গাঁথা থেকে শুরু করে প্রথম ৬ মাস তখনও ফল বা ডাব কচি ও ছোট অবস্থায় থাকে, যার নরম টিস্যুর রস আহার করা ও বংশ বিস্তার করা মাইটসের জন্য অতি সহজ হয়।

ডাব ও নারিকেলে মাইটের উপস্থিতির লক্ষণ ও ধরণঃ নারিকেলে বা ডাবের গায়ে গাঢ় বাদামী ছোবড়া ছোবড়া দাগ দেখা গেলে বুঝতে হবে তা মাইটের আক্রমণের লক্ষণ। আক্রমণের মাত্রা অত্যাধিক হলে কচি অবস্থায় মাটিতে অপূর্ণ ডাব ঝরে পড়ে। যেগুলো টিকে যায় সেগুলোও আকারে ছোট ও অনাকাঙ্খিত আকার (ডিফরম) ধারণ করে। মাইটের আক্রমণে ডাব ও নারিকেলের স্বাভাবিক রং থাকে না, বেশী গাঢ় হয়ে বির্বণ হয়ে যায়। ভিতরের শাঁস (কারনেল) গঠন খুব কম হয় (৩০% ক্ষতি), নারিকেলের ছোবড়ার গুণাগুণ নষ্ট হয়ে তা শিল্পকারখানায় ব্যবহার অনুপোযোগী হয়।


মাইটের বিস্তার :

একই গাছের বা পার্শ্ববর্তী গাছ থেকে মাইট বাতাসের মাধ্যমে বা মৌমাছি বোলতা বা মধু আহোরনণকারী পাখির মাধ্যমে অন্য গাছে বা অপর বাগানে ছড়াতে পারে।

এছাড়াও প্রবল বাতাসের মাধ্যমে অথবা নারিকেল/ডাব বা নারিকেল চারার মাধ্যমে এক দেশে থেকে অন্য দেশে এ মাইট ছড়িয়ে পড়ে।

নিয়ন্ত্রণ/দমন ব্যবস্থাঃ

যেহেতু মাইট বোঁটার অংশে খোলের নীচে অবস্থান করে এবং নরম টিস্যুর রস খেয়ে বংশ বিস্তার করে তাই এ নিরাপদ স্থানে অবস্থানরত মাইট দমন খুব সহজ নয়। তবে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাইটের আক্রমণ প্রতিহত করা সহজ। এগুলোর বিবরণী নি¤œরূপ :

১। বাগান স্বাস্থ্য সম্মত রাখাঃ (ক) নারিকেল বাগান বা গাছ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার। এ লক্ষ অর্জনে গাছের নীচে মাইট দ্বারা আক্রান্ত ঝরে পড়ে থাকা অপুষ্ট ডাবগুলো কুড়িয়ে পুড়িয়ে ফেলা উচিত।

২। গাছে সময় মত, পরিমিত প্রয়োজনীয় খাদ্য/সার প্রয়োগ করা হলে ও প্রয়োজনীয় সেচ নিকাশ ব্যবস্থায় নারিকেল গাছের ও ফলের বৃদ্ধি বেশী হয়। তাতে মাইটের আক্রমণ হলেও ক্ষতির মাত্রা খুব কম হয়।

৩। প্রাকৃতিক (বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল) ভাবে দমনঃ

(ক) প্রিডেসিয়াম নামক এক ধরণের  রাক্ষুসে বা পরজীব ভোজী মাইট নারিকেল মাইট (ঊৎরড়ঢ়যরফ) খেতে পছন্দ করে। নারিকেল মাইট কলোনিতে এ পরভোজী মাইটের উপস্থিতিতে নারিকেল মাইটের বিস্তার রোধে অন্যতম ভূমিকা রাখবে।

(খ) এক প্রকার প্যানোজেনিক ছত্রাক যা ঐরৎংঁ:বষষধ :যড়সঢ়ংড়হরর নামে পরিচিত তা নারিকেল মাইট ধবংসের অন্যতম ছত্রাক। নারিকেল মাইট কলোনীতে এ ছত্রাকের উপস্থিতি নারিকেল মাইটের বংশ বিস্তার নিয়ন্ত্রণে থাকে।

(গ) এছাড়াও এক প্রকারের লেডিবাড বিটল এ ক্ষতিকর নারিকেল মাইট ধবংস করতে সক্ষম। তাই এ জাতের লেডিবাড বিটল চিহ্নিত করে তা বাগানে ছেড়ে দেয়ার বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে। মাইট আক্রান্ত নারিকেল গাছে/ বাগানে এ সব প্রকৃতিক শত্রুুর উপস্থিতিতে এ নারিকেল মাইটের বংশ বিস্তার ও তা দ্বারা ক্ষতির সম্ভাবনা বিনষ্ট হবে।

একই কারণে পশ্চিমা দেশেগুলো পরিবেশের দিক বিবেচনায় এনে মাকড় নাশক ব্যবহারে তারা খুব একটা উৎসাহিত নয়, নারিকেল মাইট দমনে এ সব পরভোজী ছত্রাক ও পোকা-মাকড় দ্বারা বায়োলোজিক্যাল কন্ট্রোল ব্যবস্থাপনার উপর  তারা বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারত একই ব্যবস্থায় এ মাইট দমনের লক্ষে গবেষণা শুরু করেছে।

৪। বায়ো পেষ্টি সাইড বব্যহারঃ

পরিবেশ ও পরভোজী উপকারী প্রাণী সংরক্ষণ করার দিক বিবেচনায় এনে ভারতে নারিকেল মাইট দমনে বায়ো পেষ্টিসাইড ব্যবহারের উপর বেশী গুরুত্ব আরোপ করছে। এগুলো নি¤œরূপ :

(ক) নিম তেল দিয়ে তৈরী মাকড়নাশক ব্যবহারঃ

আক্রান্ত নারিকেল গাছ ২% নিম তেল, রসুন এবং সাবানের মিক্চার দিয়ে স্প্রে করে সফলভাবে মাইট দমন করা বর্তমানে সহজ হচ্ছে। এ মিক্চার তৈরী করার জন্য ২০ মিলি নিম তেল, ২০ গ্রাম পরিষ্কার রসুন বাটা ও ৫ গ্রাম কাপড় ধোয়ার সাবান একত্রে মেশাতে হয়। এ স্প্রে মিশ্রণ তৈরীর জন্য ৫ গ্রাম  কাপড় ধোয়া সাবান ৫০০ মিলি পানিতে ভালোভাবে মিশিয়ে তাতে ২০ মিলি নিম তেল মেশাতে হয়। এরপর ২০ গ্রাম পরিষ্কার রসুনকে ভালোভাবে গুঁড়া করে বা বেটে নিয়ে তাতে সাবানগুলা পানি ও নিম তেল মিশিয়ে সমস্ত মিক্সার পাতলা কাপড় দিয়ে ছেঁকে নিয়ে তা দিয়ে স্প্রে করতে হয়। এ মিক্চার তৈরীর পর পরই স্প্রে করার কাজ সমাধা করতে হবে,  তৈরীকৃত মিক্চার রেখে দিয়ে পরের দিন ব্যবহার বা বাসী করে ব্যবহার করা উচিত হবে না।

(খ) বায়ো মাকড় নাশক ব্যবহার :

বর্তমানে এ্যাজাডাইর‌্যাথিন (অুধফরৎধপযঃরহ) নামক নিম থেকে তৈরী এক ধরনের মাকড় নাশক বাজারে পাওয়া যাচ্ছে যা নারিকেল মাইট দমনে কার্যকরি। এ মাকড় নাশক দু ধরণের ফরমুলেশনে পাওয়া যাচ্ছে। তা হতে পারে ১% অথবা ৫% ফরমুলেশনে তৈরী। এ মাকড় নাশক ব্যবহার ক্ষেত্রে ১% ফরমুলেশনের ব্যবহার করা হলে প্রতি লিটার পানিতে ৪ মিলি এবং ৫% ফরমুলেশনে তৈরী মাকড় নাশক ব্যবহার করার ক্ষেত্রে  প্রতি লিটার পানিতে ৩ মিলি এ মাকড় নাশক মিশিয়ে এ মিশ্রণ দিয়ে নারিকেল গাছের আক্রান্ত অংশ ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।


গ) স্প্রে করার সময় খেয়াল রাখতে হবে তা যেন কেবল মাত্র নারিকেল ফুল ফল ধরার প্রত্যেকটা নারিকেল কাঁদিতে স্প্রে করা হয় এবং স্প্রের ক্ষুদ্র ফোটা দিয়ে যেন নারিকেলের আক্রান্ত অংশগুলো ভালোভাবে ভেজানো হয়। খেয়াল রাখতে হবে যেন ব্যবহৃত স্প্রে যন্ত্রটি খুব ফাইন ফোটা বের হতে সক্ষম হয়। একটা নারিকেল গাছ স্প্রে করতে ১-১৫ লিটার স্প্রে মিশ্রণ যথেষ্ট।

ঘ) * স্প্রে করার কাজ বছরে অন্তত ৩ (তিন) বার করতে হবে। প্রথম বার ডিসেম্বর-ফের্রুয়ারি মাসে, দ্বিতীয় বার  এপ্রিল-জুন মাসে এবং তৃতীয় বার সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে  স্প্রে করার কাজ শেষ করতে হবে।

* খেয়াল রাখতে হবে যেন এ স্প্রের তরল পদার্থ কচি নারিকেলের বোঁটার অংশসহ সমস্ত জায়গায় ভালভাবে ভেজানো যায়।

* নারিকেলের কাঁদি ছাড়া অন্য অংশে (পাতা ও কান্ড) স্প্রে করার প্রয়োজন নেই। কেন না, বাকী অংশে নারিকেলের মাইট থাকে না।  নারিকেলের স্ত্রী ফুল যা ফল ধরা আরম্ভ হয়নি, সে অংশেও স্প্রে করা যাবে না।

* স্প্রে করার আগে অবশ্যই সংগ্রহযোগ্য ডাব ও নারিকেল পেড়ে নিতে হবে।

নারিকেল গাছের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যা গ্রহণঃ

ক) নারিকেলের বিভিন্ন অংশের উপাদান দিয়ে তৈরী ভার্মি কম্পোষ্ট তৈরী করে তা নারিকেল বাগানে বছর ব্যাপী ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে তাতে লিগনীল জাতীয় ছত্রাক ব্যবহার করতে হবে।

খ) বাগানে বা গাছের গোড়ায় সবুজ সার (বরবটি, ধৈঞ্চা) তৈরী ও ব্যবহার উদ্যোগ নিতে হবে। এগুলো গ্রীষ্মকালে মালচিং এর কাজ করবে এবং পরবর্তীতে বর্ষায় তা পঁচে জৈব সারের কাজ করবে।

গ) বছরে বর্ষার আগে ও পরে কম পক্ষে ২ বার অনুমোদিত ডোজে জৈব ও  অজৈব সার নারিকেল গাছে ব্যবহার করতে হবে

ঘ) শুকনা মৌসুমে বাগানের মাটিতে রসের পরিস্থিতি বুঝে প্রতি গাছে সপ্তাহে একবার ২০০-৪০০ লিটার পানি সেচ দিতে  হবে।

ঙ) গাছের গোড়ার চারদিকে মাটিতে রস সংরক্ষণের জন্য মালচিং ব্যবস্থা নিতে হবে। এগুলো হতে পারে :

গোড়া থেকে প্রায় ২ মিটার (রেডিয়াস) ব্যাপী স্থান নারিকেল ছোবড়া দিয়ে মালচিং ব্যবস্থা নেয়া।

একই ভাবে নারিকেল পাতা/সবুজ সার/ গ্রীন লতা পাতা দিয়ে তৈরী কম্পোষ্ট দিয়ে রস সংরক্ষণ করা।

কোকো ডাষ্ট দিযে মালচিং করার ব্যবস্থা নেয়া।

————————————–

লেখকঃ

মহাপরিচালক (অবঃ), ডিএই


নারিকেলের বাম্পার ফলন পেতে করণীয়


কৃষিবিদ এম এ মজিদ

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া নারিকেলের উৎপত্তিস্থল বলে ধরা হয়। বর্তমানে নারিকেল উৎপাদনকারী দেশ সমুহের মধ্যে ফিলিপাইন, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, ওয়েষ্ট ইণ্ডিজ, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, জ্যামাইকা, পানামা, বাংলাদেশ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। যে সব দেশ সমুদ্্েরর উপকুল বিদ্যামান সে সব দেশে নারিকেল ভাল হয়। নারিকেল গাছের বহুবিদ ব্যাবহারের জন্য একে কল্প বৃক্ষ (স্বর্গীয় গাছ) বলা হয়। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতে কম বেশী নারিকেলের হয় তবে উপকুলাঞ্চলে বেশী ভাল হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে নারিকেল চাষ হয় যার উৎপাদন প্রায় ১ লক্ষ মেট্টিক টন। বাংলাদেশে কৃষক তিনটি কারণে নারিকেলের ভাল ফলন পায় না যথা ঃ (অ) প্রাকৃতিক কারণ (যেমন মাটি ও জলবায়ু সমস্যা, জেনেটিকেলি সমস্যা, ঝড়, শিলাবৃষ্টি, খরা প্রভৃতি), (আ) রোগ ও (ই) পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয়ে। সঠিক পরিচর্চা ও রোগ-পোকামাকড় দমন করে প্রথম ক্ষতি আংশিক এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্ষতি প্রায় স¤পূর্ণ রুপে সমাধান করা সম্ভব। নীচে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলঃ

ফল না ধরা ও ঝরে পড়ার কারণসমুহ ঃ

১ গাছে পুষ্টি উপাদানের অভাব হলে ফল কম ধরে বা ঝরে পড়ে (২) কৌলিক গঠন (৩) গর্ভমুন্ডে নিম্ন পরাগহীনতা (৪) বর্ধিত ভ্রণের পুষ্টিহীনতা (৫) একই ছড়ায় অনেক গুলি ফল ধারন (৬) নির্মোচন স্তর গঠন (মাটিতে রসের অভাব বা আধিক্য ঘটলে ফল ও পত্র বৃন্তের সংযোগস্থলে নির্মোচন স্তর গঠিত হয়ে ফল ঝরে পড়ে) (৭) প্রবল ঝড় (৮) শিলাবৃষ্টি (৯) দীঘ সময় খরা (১০) মাটিতে রসের অভাব (১১) হরমোনের অসাম্যতা (১২) ত্রুটি পূর্ণ ছাঁটাই করণ (১৩) বন্ধা নারিকেল উৎপাদন (১৪) রোগ ও (১৫) পোকা-মাকড়ের আক্রমণ ইত্যাদি।

সমাধান ঃ

(অ) নারিকেল গাছের ফল ধারণ বৃদ্ধি, পরিচর্যা ও ফল ঝরা রোধ করণ ঃ

(১) সুষম সারের ব্যবহার করতে হবে। একটি ৫-১০ বছরের নারিকেল গাছে (প্রতি বছর) জৈব সার ১৫ কেজি, ইউরিয়া ০১ কেজি, টি.এস.পি ৭০০ গ্রাম, এম.পি ১.৫৫কেজি, জিপসাম ৪০০ গ্রাম, জিংক সালফেট ৩০ গ্রাম মিশ্রণ করে দুই ভাগে ভাগ করে প্রতি বছর দুই বার প্রয়োগ করতে হবে (ফেব্রুয়ারী ও আগষ্ট মাসে)। দুপুর বেলা গাছের ছায়া যতটুকু স্থানে পড়ে সেটুকু স্থানে মাটি কোপায়ে আলগা করে সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে উপরে উল্লিখিত সারগুলি গাছের বয়স ৫ বছরের নীচে হলে উহার অর্ধেক এবং গাছের বয়স ১০ বছরের বেশী হলে ইহার দেড়গুণ সার প্রয়োগ করতে হবে। (২) মাটির ধরণ অনুসারে খরার সময় সেচ দিতে হবে এবং বর্ষার সময় গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেয়া যাবে না। (৩) নারিকেলের বাগান আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। (৪) গাছের গোড়ায় গরু-মহিষ বাঁধানো বা মানুষ চলাচলের পথ রাখা যাবে না। (৫) নিষেকের পর ফুলে এক মাস পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে এক বার ২, ৪-ডি (৬০ পিপিএম) ¯েপ্র করে ফল ঝরা কমানো যায়। (৬) গাছের সবুজ পাতা ছাটাই করা যাবে না। (৭) গাছে বন্ধা নারিকেল দেখা গেলে সুষম সার ও পানি ব্যবস্থাপনা করে সমস্যা সমাধান করা যায়।

(আ) রোগ দমন

(ক) মাইজ মরা/ কুঁড়ি পচা (Bud rot)

এ রোগ ফাইটোপথোরা পালমিভোরা (চযুঃড়ঢ়ঃযড়ৎধ ঢ়ধষসরাড়ৎধ) নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা হয়ে থাকে।

লক্ষণ ঃ (১) মাইজের পাতা প্রথমে হলুদ পরে বাদামী হয়ে মরে যায়। (২) নীচের পাতা ফিকে সবুজ, পরে গাঢ়বাদামী হয়। (৩) ক্রমান্বয়ে পু®পমঞ্জুরী, ফল, কাঁদির সংযোগস্থল আক্রান্ত হয়ে ভেঙ্গে পড়ে। (৪) রোগ আক্রান্ত স্থান থেকে পচাঁ গন্ধ বের হয়। (৪) রোগের মাত্রা কম হলে ফলন কমে যায় এবং মাত্রা বেশী হলে গাছ মরে যায়।

প্রতিকার ঃ (১) মরা ও শুকনা পাতা পরিস্কার করতে হবে। (২) আক্রান্ত অংশ কিছু টিসুসহ কেটে ফেলতে হবে। (৩) বোর্দোমিশ্রণ ¯েপ্র করতে হবে। (৪) রিডোমিল ০.২% হারে বা ডাইথেন-এম-৪৫ ০.৩% হারে ¯েপ্র করতে হবে।

(খ) পাতায় দাগ পড়া (Leaf spot)

এ রোগ নারিকেল গাছের পাতায় দেখা যায়। এ কারণ হল পেসটালোডিয়া পালমেরিয়াম (Pestalotia palmarum) নামক এক প্রকার ছত্রাক।

লক্ষণ ঃ (১) প্রথমে পুরাতন পাতার উপর ছোট ছোট হলুদ রং এর দাগ দেখা যায় এবং চার পার্শ্বে ধুসর বর্ণের বেষ্টনী থাকে। (২) রোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে দাগের কেন্দ্রস্থল বড় ধুসর বর্ণ আকার ধারণ করে এবং কিছু অংশ মরে যায়। (৩) শেষ পর্যন্ত পাতার আগা, কিনারা ও পরে স¤পূর্ণ পাতা শুকাইয়া মরে যায়। (৪) পাতা নষ্ট হওয়ার ফলে গাছ দুর্বল হয়ে যায় তাই ফল কম ধরে বা ফল হলেও ঝরে পড়ে।

প্রতিকার ঃ (১) আক্রান্ত পাতা কেটে পুড়ে ফেলতে হবে। (২) গাছ পরিস্কার রাখতে হবে। (৩) সুষম সার ব্যবহার করতে হবে। (৪) ডাইথেন-এম-৪৫ ০.৩% হারে ১৫ দিন পর পর ২-৩ বার ¯েপ্র করতে হবে। (৫) বাভিসটিন বা টিলট ০.২% হারে ১৫ দিন পর পর ২-৩ বার ¯েপ্র করতে হবে।



(গ) কাণ্ডের রস ঝরা / পানি ঝরা (Stem bleedig)

গাছের কাণ্ড লম্বালম্বি ভাবে ফেটে রস ঝরতে থাকে। সেরাটোসাইটিস পেরাডোসা (Ceratocystis paradoxa) নামক এক প্রকার ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

লক্ষণ ঃ (১) কাণ্ড ফেটে যায় এবং উক্ত স্থান থেকে বাদামী বর্ণের রস ঝরতে থাকে। (২) উক্ত স্থান শুকে কালো ও শক্ত চাপড়ার মত হয়ে যায়। (৩) ক্ষতস্থান কাটলে হলদে বাদামী বর্ণে তন্ত পাওয়া যায় এবং রস সঞ্চালন নালী ছাড়া সব তন্ত নষ্ট হয়ে যায়। (৪) আক্রান্ত স্থানে বড় গর্ত সৃষ্টি হয়। (৫) ছোট গাছ হলে এক বছরে এবং বড় গাছ হলে ২-৩ বছরে মরে যায়। (৬) আক্রান্ত গাছে ফল কম হয়।

প্রতিকার ঃ (১) ট্রি (গাছ) সার্জারীর মাধ্যমে আক্রান্ত অংশ পরিস্কার করে আগুনে পুড়ে ফেলতে হবে। ( ২) সুস্থ টিসুসহ আক্রান্ত স্থান চেঁছে বোর্দোমিশ্রণ বা আলকাতরা লেগে দিতে হবে। (৩) গাছ পরিস্কার রাখতে হবে। (৪) গরম আলকাতরার সাথে কাঠের গুড়া দিয়ে গর্ত বন্ধ করে দিতে হবে।

(ঘ) ট্যাপারিং (Tapering)

এটি একটি ফিজিওজিক্যাল রোগ।

লক্ষণ ঃ (১) কাণ্ডের অগ্রভাগ ক্রমশ লম্বা ও সরু হয়ে যায়। (২) পাতা কমে যায় এবং ফল ধরা কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। (৩) আক্রমণ বেশী হলে গাছ মারা যেতে পারে। (৪) গাছের মাথা সরু হয়ে ভেঙে যায়।

প্রতিকার ঃ (১) এ রোগ সব চেয়ে বেশী হয় গাছে অপুষ্টির কারণে তাই সুষম সার ব্যবহার করতে হবে। (২) জলাবদ্ধতা বা কংকর মাটির কারণেও এ রোগ হতে পারে তাই গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেয়া যাবে না এবং সঠিক পরিচর্য়ার মাধ্যমে এ রোগ দমন করা যায়।

(ই) পোকামাকড় দমন ঃ

(ক) গণ্ডার পোকা (Rhynoceros beetle)

যে সব পোকা নারিকেলের ক্ষতি করে তার মধ্যে এ পোকা অন্যতম। বাংলাদেশে এ পোকাকে গবুরে পোকা বলা হয়। গণ্ডারের মত শিং থাকে বলে একে গণ্ডার পোকা বলা হয়।

ক্ষতির লক্ষণ ঃ (১) পূর্ণ বয়স্ক পোকা গাছের কচি ডগা আক্রমণ করে এবং গর্ত খুড়ে তার মধ্যে প্রবেশ করে। (২) কচি পাতার গোড়া এবং ফুলবতী কাদিঁর গোড়া কেটে দেয়। (৩) গাছের কেন্দ্রাংশের নরম টিসু এদের আক্রমণের প্রধান লক্ষণ। (৪) আক্রমণ বেশী হলে গাছের মাথা মরে যায় এবং ফলের সংখ্যা কমে যায়।

প্রতিকার ঃ (১) বাগানের মধ্যে ও আশেপাশে গোবর ও আবর্জনা সরিয়ে ফেলতে হবে। (২) আলোর ফাঁদ পেতে পোকা মারতে হবে। (৩) গর্তে শিক ঢুকে পোকা মারতে হবে। (৪) ডাইমেক্রম ১০০ ইসি ১৫ মিলি ১০ লিটার পানিতে মিশে ¯েপ্র করতে হবে।

(খ) লাল কেরী পোকা (Red palm weevil)

সাধারণত ৫-২০ বছর বয়েসের নারিকেল গাছে এদের আক্রমণ বেশী দেখা যায়।

ক্ষতির লক্ষণ ঃ (১) এ পোকার বাচ্চা বা গ্রাব পত্র মুকুটের গোড়ার দিকে গত করে ভিতরে ঢুকে কোষ-কলা খেতে থাকে। (২) এদের আক্রমণের অন্যতম লক্ষণ হল ছিদ্রের মুখে বাদামী বর্ণের চটচটে গদের আটার মত উজ বা চিবানো কাঠের গুড়ার মত দেখা যায়।

প্রতিকার ঃ (১) বাগানের মধ্যে শুকনো লতাপাতা বা গোবর, আবর্জনা ধংস করে ফেলতে হবে। (২) আলোর ফাঁদ পেতে পোকা মারতে হবে। (৩) গর্তে শিক ঢুকে পোকা মারতে হবে। (৪) ডাইমেক্রম ১০০ ইসি ১৫ মিলি ১০ লিটার পানিতে মিশে ¯েপ্র করতে হবে।

(গ) ইদুঁর দমন ঃ

ইদুঁর দ্বারা প্রতি বছর নারিকেলের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়ে থাকে (এক গবেষণায় দেখা যায় মোট উৎপাদনের ১০% ইদুঁর দ্বারা নষ্ট হয়)। বাগানের যতœ না নিলে বা গাছ বেশী ঘন হলে ইদুঁর এক গাছ থেকে আর এক গাছে চলাচল করে ও আক্রমণ বেশী হয়।

প্রতিকার ঃ (১) গাছের গোড়া থেকে কিছু উপরে (এক বা দুই মিটার উপরে) কাণ্ডের চার পার্শ্বে ঘুরিয়ে টিনের পাত দিয়ে চ্যাপ্টা রিং পরিয়ে দিলে ইদুঁর গাছে উঠতে পারে না। (২) রেকুমিন বা জিংক ফসফাইড (ইদুঁর মারার বিষ) বিষটোপ ব্যবহার করা যেতে পারে। উপরের পরামর্শসমুহ অনুযায়ী কাজ করতে পারলে সহজে নারিকেলের ভাল ফলন নিশ্চিত করা যেতে পারে।

লেখক ঃ পি-এইচ.ডি গবেষক, রাবি। প্রভাষক কৃষিশিক্ষা বিভাগ, নাটোর সিটি কলেজ, নাটোর।

ফরিদপুরের কালো সোনা




পেঁয়াজ একটি জনপ্রিয় মসলা ও সবজি। এটি Liliaceae পরিবারের শল্ককন্দ জাতীয় ফসল যার বৈজ্ঞানিক নাম Allium cepa L. যে পেঁয়াজের ঝাঁঝ হয়ে থাকে তা হল অ্যালিল প্রপাইল ডাইসালফাইড। গাছ বড় হবার সাথে সাথে পেঁয়াজের ঝাঁঝও বাড়তে থাকে। পেঁয়াজের বীজ উত্পাদনের জন্য ফুলের শারীরতাত্ত্বিক গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেঁয়াজের কন্দ এবং বীজ উত্পাদন একটি অপরটির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো জেলায় পেঁয়াজের চাষ হয়। তারমধ্যে পাবনা, ফরিদপুর, যশোহর, রাজশাহী, বগুড়া, মানিকগঞ্জ, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, কুমিল্লা, টাংগাইল, মুন্সিগঞ্জ ও নরসিংদীতে প্রচুর পরিমাণ পেঁয়াজ উত্পাদন হয়। কিন্তু পেঁয়াজের বীজ উত্পাদনে ফরিদপুরের নাম সবার আগে আসে।

বাংলাদেশে সাধারণত রবি মৌসুমে পেঁয়াজের চাষ হয়। প্রায় ৩৩,২৬০ হেক্টর জমিতে মোট পেঁয়াজ উত্পাদন হয় প্রায় ১,৩১,০৯০ মে.টন। বাংলাদেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ থেকে ৬ লক্ষ মে.টন। কিন্তু পেঁয়াজ বীজের ক্ষেত্রে কৃষকদের উত্পাদিত বীজ পুরোপুরি মানসম্মত নয়। তাই ভাল বীজের জন্য অবশ্যই বীজ উত্পাদনের উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, বীজের ফলন মূলতঃ জাত, স্থান, মৌসুম ও বীজ উত্পাদন প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল।

দেশে পেঁয়াজ বীজের যে চাহিদা আছে তার ৭০ ভাগই উত্পাদন হয় ফরিদপুরে। আর এ অর্জন একদিনে হয়নি। বিভিন্নভাবে দিনের পর দিন নানামুখী সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পর আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কৃষকরা। বছরের পর বছর ধরে বেড়েই চলেছে এ অঞ্চলের পেঁয়াজ বীজের উত্পাদন। এর সাথেই পরিবর্তন ঘটেছে কৃষকের ভাগ্যের। এখন এলাকার কমবেশি সব কৃষকই পেঁয়াজের বীজ উত্পাদনের সাথে জড়িত। দীর্ঘদিন এ কাজের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তাদের রয়েছে নানামুখী অভিজ্ঞতা। বৈরি জলবায়ু, মাঠের নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও এগিয়ে যাচ্ছেন তারা। আর তাদের এই এগিয়ে চলার সাথে সাথী হয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএডিসি’র একটি প্রকল্প। উপকরণ সহায়তা থেকে শুরু করে কৃষকদের বীজ উত্পাদনের প্রশিক্ষণও দিচ্ছে ওই প্রকল্প। চলতি ২০১১-১২ বর্ষে ১৮ মে.টন পেঁয়াজ বীজ ও ৯৫ মে.টন বাল্ববীজ উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পেঁয়াজ বাল্ববীজ সংরক্ষণের জন্য ফরিদপুর বিএডিসি’র নিজস্ব হিমাগার রয়েছে যেখানে উন্নত প্রযুক্তিতে ০ থেকে ২০ সে. তাপমাত্রা ও ৬৫ থেকে ৭০% আর্দ্রতায় পরবর্তী মৌসুমে উত্পাদনের জন্য পেঁয়াজ বাল্ববীজ সংরক্ষণ করা হয়।

যে সমস্ত স্থানে খুব বেশি ঠাণ্ডা বা গরম পড়ে না এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হয় না, সে সব স্থানে পেঁয়াজ এবং বীজ খুব ভাল হয়। প্রচুর দিনের আলো, অনধিক উত্তাপ ও মাটিতে প্রয়োজনীয় রস থাকলে, পেঁয়াজ ও বীজের ফলন দুই-ই খুব ভাল হয়। ছোট অবস্থায় যখন পেঁয়াজের পাতা বাড়তে থাকে তখন ১৫০ সে. তাপমাত্রা ও ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা দিনের আলো থাকলে পেঁয়াজ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং পরে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা দিনের আলো ও ২১০ সে. তাপমাত্রা এবং গড় আর্দ্রতা ৭০% থাকলে পেঁয়াজের কন্দ ভালভাবে বাড়ে। বীজ উত্পাদনের জন্য কিছুটা ঠাণ্ডা পরিবেশের প্রয়োজন হয়। এ অবস্থায় ৪.৫ থেকে ১৪০ সে. তাপমাত্রায় প্রতিটি কদমে অধিক সংখ্যক ফুল ও পুষ্ট বীজ হয় এবং ফলন বৃদ্ধি পায়। পুষপদণ্ড বের হওয়ার সময় ১০ থেকে ১২০ সে. তাপমাত্রার প্রয়োজন। এই তাপমাত্রা উত্পাদন মৌসুমে বিশেষ করে জানুয়ারি-ডিসেম্বর মাসে বিরাজ করে। পুসপায়ন পর্যায়ে পরিষ্কার ও উজ্জ্বল দিনের আলোয় পরাগায়নের জন্য অধিক সংখ্যক পোকা সক্রিয় থাকে। বীজ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ সময়ে উষ্ণ শুষ্ক আবহাওয়াও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাযুক্ত হালকা দো-আঁশ বা পলিযুক্ত মাটি পেঁয়াজ বীজ চাষের পক্ষে সবচেয়ে ভাল। হালকা বেলে-দো-আঁশ মাটিতে এঁটেল মাটির চেয়ে পেঁয়াজ অনেক আগে পরিপক্বতা আসে। রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে চাষ করলে পেঁয়াজ বেশ বড় ও ভারী হয় এবং সেগুলো অনেক দিন সংরক্ষণ করা যায়। পরবর্তীতে উক্ত কন্দ থেকে উন্নত পুষ্ট, সজীব ও নিরোগ বীজ পাওয়া যায়। এঁটেল মাটি শক্ত হয়ে যায় বলে পেঁয়াজের কন্দ ভালভাবে বাড়তে পারে না ফলে পুষপদণ্ড সঠিকভাবে বাড়তে পারে না এবং ফলন কম হয়। অধিক অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব মাটিতে পেঁয়াজ আস্তে আস্তে বাড়ে, ছোট হয় এবং ফসলের পরিপক্বতা দেরিতে হয়। মাটির পিএইচ ৫.৮ থেকে ৬.৮ থাকলে পেঁয়াজের কন্দ ও বীজের ফলন ভাল হয়। পেঁয়াজ বীজ উত্পাদনের সবকিছুই বিদ্যমান বৃহত্তর ফরিদপুর জেলাতে। এ জেলার মাটি যেন পেঁয়াজ চাষিদের জন্য এক আশীর্বাদ। এ মাটিতে উত্পাদিত পেঁয়াজ বীজকে স্থানীয়রা কালো মানিক বা কালো সোনা বলে থাকেন। প্রচলিত কথা আছে যে, কয়েক কেজি পেঁয়াজের বীজ বিক্রি করলে এক ভরি সোনা পাওয়া যেত। পেঁয়াজ বীজ উত্পাদনে সাফল্য ধরা দেবার পর সরকারিভাবে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। তারই অংশ হিসেবে কৃষকদের সাথে বিএডিসির চুক্তিভিত্তিক বীজ উত্পাদনের কার্যক্রম রয়েছে। কৃষকরা যাতে পেঁয়াজ বীজ উত্পাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয় সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সকল সুযোগ-সুবিধা কৃষকদের দেয়া হয় বলে জানান বিএডিসি’র জাতীয় সবজি বীজ প্রোগ্রামের পরিচালক মোঃ মাহবুবুর রহমান। তিনি আরো উল্লেখ করেন, কৃষকদের সাথে আলোচনা করেই চলতি মৌসুমের বীজের মূল্য নির্ধারণ করেছে বিএডিসি কর্তৃপক্ষ। 

গোবিন্দপুরের বখতিয়ার খান। পেঁয়াজের বীজ যাদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম কৃষক। তার সফলতা এখন এই এলাকায় এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। তার জমিতে উত্পাদিত পেঁয়াজের বীজ বিক্রি করে তিনি নির্মাণ করেছেন পাকা বাড়ি। তবে সফলতার এই পর্যায়ে এসে সংশ্লিষ্ট অধিদফতরগুলোর কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণাও বদলে গেছে। বাজার ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকি সুবিধা বৃদ্ধি পেলে বৃহত্তর ফরিদপুরের চাষাবাদে আরো অগ্রগতি আসবে বলে বিশ্বাস করেন তিনি। একই গ্রামের ক্ষুদ্র চাষি আক্কাস মণ্ডল। এবার ১ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন পেঁয়াজের বীজ। তিনি বলছেন নানা সমস্যার কথা। ভারতীয় নিম্নমানের বীজের কারণে তাদের উত্পাদিত বীজে বর্তমানে লোকসান গুনতে হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে এই সমস্যার সমাধান দরকার। অম্বিকাপুরের সোহরাব হোসেনসহ আরো অনেক কৃষক বলেছেন, ভারতীয় বীজের আগ্রাসন বন্ধ করে দেশি বীজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিলে পেঁয়াজ বীজ বিদেশে রফতানি করাও সম্ভব। বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের প্রায় সকল কৃষকের বাড়িতেই পেঁয়াজের বীজ সংরক্ষণ করা হয় পুরানো পদ্ধতিতে। উত্পাদিত বীজ রোদে শুকিয়ে বড় মাটির কলসে মধ্যে রেখে দেয়া হয়। আর এটিই বাড়ি বাড়ি থেকে কিনে নিয়ে যান দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা। পেঁয়াজের বীজ বিক্রির জন্য এ অঞ্চলে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো নির্দিষ্ট বাজার। একটা হিমাগার তৈরি হয়েছে যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

পেঁয়াজের বীজ উত্পাদনে দারুণ সাফল্যের নজির সৃষ্টিকারী বহু কৃষকের দাবি সময় উপযোগী প্রযুক্তি সহায়তা, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা ও বীজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। তারা বলছেন এটি করা হলে এ অঞ্চলের কৃষকরা দেশের শতভাগ পেঁয়াজ বীজের চাহিদা পূরণ করতে সমর্থ হবেন। তাদের এই আত্মবিশ্বাসকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে এগিয়ে আসবেন এটাই তাদের প্রত্যাশা। 

উপসহকারী কৃষি অফিসারের কার্যবলি


আমরা কৃষি ডিপ্লোমা ভাইরা আপনাদের উপকারের স্বার্থে আমি শোভন আজ আপনাদের সাথে  উপসহকারী কৃষি অফিসারের কার্যবলি নিয়ে আলোচনা করবো ।এই কাজগুলো আপনার জেনে রাখা অতন্ত্য জরুরি।

উপসহকারী কৃষি অফিসারের কার্যবলি:

১। কৃষকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে।
২। কৃষকের সাথে মত বিনিময় করতে হবে।
৩। কৃষি বিষয়ক উন্নত প্রযুক্তি সমূহ কৃষকদের নিকট হস্তান্তর করতে হবে।
৪। উন্নত প্রযুক্তি সম্পার্কে কৃষকদের হাতে কলমে শিক্ষা দিতে হবে।
৫। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাত করণে এবং ন্যায্যমূল্য পেতে সহায়তা প্রদান।
৬। কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ,প্যাকেজিং ও নানাবিধ ব্যবহার মুখী পণ্যে রুপান্তরে কারিগরী সহায়তা প্রদান।
৭। সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান হতে কৃষি ঝণ প্রাপ্তিতে সহায়তা প্রদান।
৮। কৃষি বিষয়ক যেকোন তথ্য, পরামর্শ এবং প্রযুক্তি কৃষিকর্মী কৃষক এবং সাধারণ জনগণ এর মধ্য পৌছানো।
৯। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন সরকারী,বেসরকারী ও গবেষণা সংস্থার সাথে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে সম্প্রসারণ সেবা প্রদান।
১০। মাঠ পর্যায়ে কৃষকের সাথে কাজ করা।
১১। কৃষকের চাষকৃত ফসলের সমেস্যা চিহ্নিত করণ এবং সমাধান।
১২। অফিস পর্যায়ে কাজ করা।

আসাকরি এই পয়েন্ট গগুলো মনে রাখতে পারলে আপনি উপর্কৃত হবেন।

পশ্নটি বইয়ের ভাষায় এবং নিজের ভাষা হতে সংকলন করা হয়েছে, শুধু মত্র আপনাদের মনে রাখার উদ্দেশ্যে।


ভেজাল সার চেনার উপায়

অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফসল উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সারে ভেজাল দ্রব্য মিশিয়ে নকল সার বা ভেজাল সার তৈরি ও বিক্রি করছেন। কৃষকভাইয়েরা একটু সতর্ক হলেই আসল সার ও ভেজাল সারের পার্থক্য বুঝতে পারবেন। এখানে কয়েকটি সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে আসল বা ভেজাল সার শনাক্ত করার উপায় সম্পর্কে জানানো হলো:
 
ইউরিয়া সার চেনার উপায়: 
আসল ইউরিয়া সারের দানাগুলো সমান হয়। তাই কেনার সময় প্রথমেই দেখে নিতে হবে যে সারের দানাগুলো সমান কিনা। ইউরিয়া সারে কাঁচের গুড়া অথবা লবণ ভেজাল হিসাবে যোগ করা হয়। চা চামচে অল্প পরিমান ইউরিয়া সার নিয়ে তাপ দিলে এক মিনিটের মধ্যে অ্যামোনিয়ার ঝাঁঝালো গন্ধ তৈরি হয়ে সারটি গলে যাবে। যদি ঝাঁঝালো গন্ধ সহ গলে না যায়, তবে বুঝতে হবে সারটি ভেজাল।

 
টিএসপি সার চেনার উপায়:
টিএসপি সার পানিতে মিশালে সাথে সাথে গলবে না। আসল টিএসপি সার ৪ থেকে ৫ ঘন্টা পর পানির সাথে মিশবে। কিন্তু ভেজাল টিএসপি সার পানির সাথে মিশালে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই গলে যাবে বা পানির সাথে মিশে যাবে।

 
ডিএপি সার চেনার উপায়:
ডিএপি সার চেনার জন্য চামচে অল্প পরিমান ডিএপি সার নিয়ে একটু গরম করলে এক মিনিটের মধ্যে অ্যামোনিয়ার ঝাঁঝালো গন্ধ হয়ে তা গলে যাবে। যদি না গলে তবে বুঝতে হবে সারটি সম্পূর্ণরুপে ভেজাল। আর যদি আংশিকভাবে গলে যায় তবে বুঝতে হবে সারটি আংশিক পরিমান ভেজাল আছে। এছাড়াও কিছু পরিমান ডিএপি সার হাতের মুঠোয় নিয়ে চুন যোগ করে ডলা দিলে অ্যামোনিয়ার ঝাঁঝালো গন্ধ বের হবে। যদি অ্যামোনিয়ার ঝাঁঝালো গন্ধ বের না হয় তাহলে বুঝতে হবে সারটি ভেজাল।

 
এমওপি বা পটাশ সার চেনার উপায়:
পটাশ সারের সাথে ইটের গুড়া ভেজাল হিসাবে মিশিয়ে দেয়া হয়। গ্লাসে পানি নিয়ে তাতে এমওপি বা পটাশ সার মিশালে সার গলে যাবে। তবে ইট বা অন্য কিছু ভেজাল হিসাবে মিশানো থাকলে তা পানিতে গলে না গিয়ে গ্লাসের তলায় পড়ে থাকবে। তলানি দেখে সহজেই বুঝা যাবে সারটি আসল নাকি ভেজাল।

 
জিংক সালফেট সার চেনার উপায়:
জিংক সালফেট সারে ভেজাল হিসাবে পটাশিয়াম সালফেট মেশানো হয়। জিংক সালফেট সার চেনার জন্য এক চিলতে জিংক সালফেট হাতের তালুতে নিয়ে তার সাথে সমপরিমান পটাশিয়াম সালফেট নিয়ে ঘষলে ঠান্ডা মনে হবে এবং দইয়ের মতো গলে যাবে।